
পুলিশ সুপারের নির্দেশে নওগাঁ জেলা পুলিশের অভিযানে গভীর রাতে শহরের ৯টি হোটেলে একযোগে তল্লাশি, প্রতারক চক্রের ৪ সদস্যসহ ৫ জন গ্রেপ্তার
নওগাঁ জেলা বিশেষ প্রতিনিধি :মোঃ রাফি হোসেন
নওগাঁ শহরে একই দিনে সংঘটিত দুটি চাঞ্চল্যকর প্রতারণার ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে প্রতারক চক্রের চার সদস্যসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া স্বর্ণালংকারের একটি অংশও উদ্ধার করেছে পুলিশ। পলাতক অন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২৩ জুন ২০২৬ নওগাঁ সদর থানা এলাকায় একই দিনে রাসায়নিক স্প্রে বা কথিত "শয়তানের নিঃশ্বাস" প্রয়োগ করে দুইটি পৃথক ঘটনায় বয়স্ক ব্যক্তিদের স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র।
প্রথম ঘটনায়, নওগাঁ শহরের চুড়িপট্টি এলাকায় নওগাঁ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের সামনে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ফাতেমা বেগম (৭০) নামে এক বৃদ্ধাকে অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজন ব্যক্তি অচেতন করে। পরে কৌশলে তাকে একটি রিকশায় তুলে নিয়ে তার গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন, কানের দুল এবং নগদ পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে ডিগ্রীর মোড় সংলগ্ন ময়লা ফেলার স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২৫ জুন ২০২৬ তিনি মারা যান।
একই দিনে সংঘটিত দ্বিতীয় ঘটনায়, এক বৃদ্ধ দম্পতি ছেলের বাড়িতে যাওয়ার পথে নওগাঁর ঢাকা বাসস্ট্যান্ড থেকে লিটন ব্রিজের মাঝামাঝি এলাকায় প্রতারক চক্রের সদস্যরা স্বর্ণের বার দেখিয়ে লোভের ফাঁদে ফেলে। পরে রাসায়নিক স্প্রে প্রয়োগ করে তাদের সম্মোহিত করে জোরপূর্বক প্রায় ৬ আনা ওজনের একজোড়া স্বর্ণের কানের দুল হাতিয়ে নেয়।
এ দুটি ঘটনায় নওগাঁ সদর মডেল থানায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়।
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে নওগাঁ জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম-এর নির্দেশনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম), নওগাঁ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ এবং জেলা গোয়েন্দা শাখার সমন্বয়ে একটি বিশেষ তদন্ত টিম গঠন করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ সুপারের নির্দেশে সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আসাদুজ্জামান-এর নেতৃত্বে ২৭ জুন গভীর রাতে নওগাঁ শহরের ৯টি আবাসিক হোটেলে একযোগে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন এলাকায়ও অভিযান চালানো হয়।
অভিযানে নওগাঁ রেস্ট হাউস হোটেলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে গাইবান্ধা জেলার আব্দুল হাই, এরশাদ আলী ও বাবলু এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার মো. কালামকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা স্বীকার করেন, তারা আরও দুই-তিনজন সহযোগীকে নিয়ে দ্বিতীয় ঘটনাটি সংঘটিত করেছেন। তারা স্বর্ণের বার দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে এবং রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহার করে বৃদ্ধ দম্পতির স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেন।
তদন্তে আরও জানা যায়, চুরি হওয়া স্বর্ণের কানের দুল নওগাঁ স্বর্ণপট্টির মুহিব জুয়েলার্স-এর ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর-এর কাছে বিক্রি করা হয়। পরে জেলা গোয়েন্দা শাখা এরশাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাহাঙ্গীরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি চোরাই স্বর্ণ কেনার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি জানান, কানের দুল গলিয়ে ফেলা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গলানো অবস্থায় ৪ আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, জাহাঙ্গীর এর আগেও নওগাঁ স্বর্ণপট্টিতে চোরাই স্বর্ণ ক্রয়-বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও জানা যায়, চুরি হওয়া বাকি স্বর্ণালংকার ও অর্থ তাদের পলাতক সহযোগীদের কাছে রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তার এবং অবশিষ্ট মালামাল উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নওগাঁ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতারণা, ছিনতাই ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে।